








বোধি বৃক্ষের নীচে বুদ্ধের জ্ঞানলাভ
মারের পরাজয় ও চারটি সত্যের উপলব্ধি
এই নিবন্ধে বুদ্ধের বোধি বৃক্ষের নীচে ধ্যানে বসে সত্য না পাওয়া পর্যন্ত না ওঠার সংকল্প, মারের প্রলোভন ও ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা, এবং সেই রাতে চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করে বুদ্ধত্ব লাভের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
সিদ্ধার্থ গৌতম ছিলেন এক রাজপুত্র, যিনি প্রাসাদের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে মানুষের দুঃখের কারণ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। বহু বছর কঠোর তপস্যা ও ধ্যানের পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে চরম কষ্টও সত্যের পথ নয়। তাই তিনি একদিন পবিত্র বোধি বৃক্ষের নীচে (যে গাছের নীচে তিনি বসেছিলেন) দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বসলেন — "আমি সত্য না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে উঠব না।" তাঁর এই দৃঢ়তা দেখে মর্ত্যের মোহ ও মায়ার অধিপতি মারা (যাকে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে মৃত্যু ও কামনার দেবতা বলা হয়) ভয় পেয়ে গেল। সে তাঁর ধ্যান ভাঙতে নানা রূপে এল। প্রথমে সে তাঁর সামনে তিন সুন্দরী কন্যাকে পাঠাল, যারা নানা লোভনীয় ভঙ্গিতে তাঁকে প্রলুব্ধ করতে চাইল। কিন্তু সিদ্ধার্থের মন বিচলিত হলো না। তখন মারা ভয়ংকর রূপ ধারণ করল — হাজার হাজার সশস্ত্র সৈন্য, প্রচণ্ড ঝড়, বন্যা, অগ্নি — সবকিছু দিয়ে তাঁকে ভয় দেখাতে চাইল। কিন্তু সিদ্ধার্থ মাটি স্পর্শ করে (যাকে ভূমিস্পর্শ মুদ্রা বলা হয়) পৃথিবীকে সাক্ষী রেখে বললেন, "আমি বহু জন্ম ধরে দান, শীল ও তপস্যা করেছি; এই পৃথিবীই আমার সাক্ষী।" তখনই মারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেল। সেই রাতে, প্রথম প্রহরে তিনি তাঁর পূর্বজন্মের স্মৃতি দেখতে পেলেন; দ্বিতীয় প্রহরে দেখলেন কীভাবে জীবেরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরছে, তাদের কর্ম অনুযায়ী সুখ-দুঃখ পাচ্ছে; তৃতীয় প্রহরে তিনি বুঝতে পারলেন দুঃখের মূল কারণ এবং তা থেকে মুক্তির পথ। এই জ্ঞানই হলো চারটি আর্যসত্য (যাকে সংস্কৃতে চতুরার্যসত্য বলা হয়): প্রথমত, জীবনে দুঃখ আছে; দ্বিতীয়ত, এই দুঃখের কারণ আছে — তা হলো তৃষ্ণা বা আসক্তি; তৃতীয়ত, এই তৃষ্ণা দূর করলে দুঃখও দূর হয়; এবং চতুর্থত, এই তৃষ্ণা দূর করার পথ আছে — যাকে বলা হয় অষ্টাঙ্গিক মার্গ (আটটি সঠিক পথ)। এই সত্য উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন — অর্থাৎ যিনি জাগ্রত বা সত্যকে জানতে পেরেছেন। সেই ভোরবেলায় তিনি বোধি বৃক্ষের নীচে থেকে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে ছিল অপরিমেয় শান্তি। এই ঘটনা ঘটেছিল বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের বোধগয়া নামক স্থানে, যা আজও বৌদ্ধদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান। বুদ্ধের এই জ্ঞানলাভের পর তিনি তাঁর প্রথম শিক্ষা দিয়েছিলেন বারাণসীর কাছে সারনাথে, যেখানে তিনি পাঁচজন সন্ন্যাসীকে এই চারটি সত্য ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ঘটনাকে বৌদ্ধরা 'ধর্মচক্র প্রবর্তন' বলে, অর্থাৎ সত্যের চাকা ঘোরানো। বুদ্ধের এই জ্ঞানলাভের কাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে বলা হয়, তবে মূল ঘটনা — বোধি বৃক্ষের নীচে ধ্যান, মারার পরাজয় এবং চারটি সত্যের উপলব্ধি — সব বৌদ্ধ সম্প্রদায়েই একই রকম।
আপনি কি জানেন?
স্থান
বোধি বৃক্ষের নীচে বুদ্ধের জ্ঞানলাভ ঘটেছিল বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের বোধগয়ায়। এই স্থানটি বৌদ্ধদের সর্বাধিক পবিত্র তীর্থ, এবং সেখানে বর্তমান গাছটি মূল বোধি বৃক্ষের বংশধর বলে বিবেচিত।
ভূমিস্পর্শ মুদ্রা
মারের ভয় দেখানোর সময় বুদ্ধ মাটি স্পর্শ করে পৃথিবীকে সাক্ষী রেখেছিলেন। এই অঙ্গভঙ্গি ‘ভূমিস্পর্শ মুদ্রা’ নামে পরিচিত এবং বৌদ্ধ শিল্পে বুদ্ধের জ্ঞানলাভের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক।
তিন প্রহরের জ্ঞান
সেই রাতে বুদ্ধ তিনটি প্রহরে তিনটি স্তরের জ্ঞান লাভ করেন। প্রথম প্রহরে তিনি তাঁর পূর্বজন্মের স্মৃতি দেখেন, দ্বিতীয় প্রহরে জীবের জন্ম-মৃত্যু চক্র ও কর্মফল বুঝতে পারেন, এবং তৃতীয় প্রহরে চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করেন।
চার আর্যসত্য
বুদ্ধের জ্ঞানলাভের মূল বিষয়বস্তু হলো চারটি সত্য: (১) জীবনে দুঃখ আছে, (২) দুঃখের কারণ তৃষ্ণা বা আসক্তি, (৩) তৃষ্ণা দূর করলে দুঃখ দূর হয়, এবং (৪) এই দূর করার পথ হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ (আটটি সঠিক পথ)।
প্রথম শিক্ষা
জ্ঞানলাভের পর বুদ্ধ তাঁর প্রথম শিক্ষা দেন বারাণসীর কাছে সারনাথে, পাঁচজন সন্ন্যাসীকে। এই ঘটনাকে ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ বলা হয়, অর্থাৎ সত্যের চাকা ঘোরানো, যা বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করে।
Buddha
বৌদ্ধধর্ম থেকে আরও
সম্পর্কিত শিক্ষা
একই শিক্ষা, বিভিন্ন ঐতিহ্যে প্রতিধ্বনিত