সম্রাট অশোকের মহান রূপান্তর এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসার
কালিঙ্গ যুদ্ধের রক্তপাত কীভাবে একজন নিষ্ঠুর বিজয়ীকে অনুতপ্ত বৌদ্ধ ধর্মানুরাগীতে পরিণত করেছিল এবং কীভাবে তিনি ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৌদ্ধধর্মকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার বিবরণ এই নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে সম্রাট অশোক ছিলেন মৌর্য রাজবংশের এক অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক। রাজত্বের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন একজন উচ্চাভিলাষী এবং নিষ্ঠুর conqueror বা বিজেতা, যিনি তরবারির জোরে একের পর এক রাজ্য জয় করে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের নবম বছরে সংঘটিত হয়েছিল এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যা ইতিহাসে কালিঙ্গ যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সম্রাট অশোকের অন্তরে এক গভীর মানসিক আঘাত হানে। যুদ্ধক্ষেত্রের চারপাশের আর্তনাদ, স্বজনহারা মানুষের কান্না এবং লাশের পাহাড় তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং তাঁর মনের ভেতর এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে তরবারির শক্তি দিয়ে সাময়িক জয় পাওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় কেবল অহিংসা এবং করুণার মাধ্যমে। এই প্রবল অনুতাপের পর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের শান্তির বাণীর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিতেও তিনি হিংসার পথ চিরতরে ত্যাগ করেন। অস্ত্র সংবরণ করে তিনি ধর্মের পথে চলার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রজার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যজুড়ে পাথর ও স্তম্ভের গায়ে খোদাই করে বিভিন্ন উপদেশ লিপি বা আদেশ জারি করেন, যা ইতিহাসে অশোক স্তম্ভ ও শিলালিপি নামে পরিচিত। এই লিপিগুলিতে অহিংসা, সত্যবাদিতা, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সকল প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। বৌদ্ধধর্মের মূল বাণীগুলিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলির সঠিক শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি নানা স্থানে স্তূপ ও বিহার নির্মাণ করেন। সম্রাট অশোক কেবল নিজের রাজ্যেই এই শান্তির বার্তা প্রচার করে ক্ষান্ত হননি। তিনি শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দূরবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা প্রচারকদের প্রেরণ করেছিলেন, যাতে বুদ্ধের অহিংসা ও শান্তির বাণী বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁর এই দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই বৌদ্ধধর্ম একটি স্থানীয় মতবাদ থেকে ধীরে ধীরে একটি বিশ্বধর্মে রূপান্তরিত হয়। সম্রাট অশোকের এই রূপান্তর এবং তাঁর শাসনকাল মানব ইতিহাসের পাতায় শান্তি, অহিংসা ও অনুতাপের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আজও অমর হয়ে আছে।
আপনি কি জানেন?
কালিঙ্গ যুদ্ধের সময়কাল ও ক্ষয়ক্ষতি
সম্রাট অশোকের রাজত্বের নবম বছরে (খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ অব্দে) সংঘটিত কালিঙ্গ যুদ্ধেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিহত এবং দেড় লক্ষ বন্দী হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
অশোকের অনুতাপ ও ধর্মান্তর
যুদ্ধক্ষেত্রের আর্তনাদ ও লাশের পাহাড় দেখে অশোক গভীরভাবে অনুতপ্ত হন এবং বুঝতে পারেন যে তরবারির জোরে মন জয় করা যায় না। তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন এবং অহিংসা ও করুণাকে রাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি করেন।
অশোকের শিলালিপি ও স্তম্ভ
অশোক তাঁর সাম্রাজ্যজুড়ে পাথর ও স্তম্ভের গায়ে ধর্মীয় উপদেশ খোদাই করান, যা অশোক স্তম্ভ ও শিলালিপি নামে পরিচিত। এগুলিতে অহিংসা, সত্যবাদিতা, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সকল প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে।
বৌদ্ধধর্মের প্রসারে অশোকের ভূমিকা
অশোক কেবল নিজ রাজ্যেই নয়, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী প্রেরণ করেন। তাঁর এই উদ্যোগ বৌদ্ধধর্মকে একটি স্থানীয় মতবাদ থেকে বিশ্বধর্মে পরিণত করে।
স্তূপ ও বিহার নির্মাণ
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা প্রচারের জন্য অশোক ভারতজুড়ে অসংখ্য স্তূপ ও বিহার নির্মাণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো সাঁচীর স্তূপ, যা আজও বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
Buddha
বৌদ্ধধর্ম থেকে আরও
সম্পর্কিত শিক্ষা
একই শিক্ষা, বিভিন্ন ঐতিহ্যে প্রতিধ্বনিত
