শ্রী শ্যাম চালিশা
শ্রী শ্যাম চালিশা হল ভগবান শ্যাম (খাটু শ্যাম বা বর্ভরীক) এর গুণগান ও স্তুতি সম্বলিত একটি ভক্তিমূলক কবিতা। এটি চল্লিশটি চৌপাই ও কয়েকটি দোহা নিয়ে গঠিত, যা নিয়মিত পাঠ করলে ভক্তদের মনোবাঞ্ছিত ফল লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
শ্লোক
মঙ্গলাচরণ (দোহা)
চালীসা পাঠের পূর্বে গুরু বন্দনা ও মঙ্গলাচরণ দোহা।
শ্রীগুরুর চরণে ধ্যান করে, সচ্চিদানন্দ স্বরূপকে স্মরণ করে, আমি শ্রীশ্যামচালিশা রচনা করছি পরম আনন্দের সাথে।
শ্লোক Dohā 1
শীর্ষদানী ও বলিদানীকে বারবার প্রণাম। তিনি কলিযুগের অবতার, খাটু নিবাসী শ্যামদেব।
শ্লোক Dohā 2
চালীসা (৪০টি চৌপাই)
প্রভুর অপার মহিমা, বল ও করুণার গুণকীর্তনকারী মূল ৪০টি চৌপাই।
জয় শ্রীশ্যাম হরে, সুখদাতা! কলিযুগে তুমি ভাগ্যবিধাতা।
শ্লোক 1
হে দেব, তুমি খাটু ধামে বিরাজ করছ। দেব ও দানব সকলে তোমার সেবা করে।
শ্লোক 2
মোরবী নন্দন বীর বভ্রুবাহন ও ঘটোৎকচ—তোমার কুলকে উজ্জ্বল করেছ।
শ্লোক 3
যখন মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হলো, কৌরব ও পাণ্ডব সৈন্যদল সাজিয়ে এলো।
শ্লোক 4
তখন তুমি মাতাকে বচন দিয়েছিলে—পরাজিতেরই পক্ষ নেবে।
শ্লোক 5
তিনটি বাণ নিয়ে রণক্ষেত্রে এসে কৃষ্ণের পরীক্ষা করতে উদ্যত হলে।
শ্লোক 6
পিপুলপত্র ছিদ্র করে দেখালে, এক বাণেই সব বিদ্ধ করালে।
শ্লোক 7
কৃষ্ণকে নিজের শির দান করলে, নিজের সর্বস্ব অর্পণ করলে।
শ্লোক 8
প্রসন্ন হয়ে হরি তোমাকে বর দিলেন—তোমার নাম 'শ্যাম' জগতে বিখ্যাত হলো।
শ্লোক 9
কলিযুগে সমস্ত সংসার তোমাকে পূজে; যে ধ্যান করে, সে পার হয়।
শ্লোক 10
ফাল্গুন শুক্ল দ্বাদশীতে মেলা বসে; লক্ষদাতা সব লীলা করেন।
শ্লোক 11
নিশান চড়িয়ে যে দরবারে আসে, সেই নর মানবাঞ্ছিত ফল পায়।
শ্লোক 12
শ্যামকুণ্ডে যে নর স্নান করে, তার পাপ-তাপ দূর হয়।
শ্লোক 13
অমৃততুল্য জল সুখকর, রোগ কেটে যায়, বীমারী মিটে।
শ্লোক 14
হে স্বামী, পরাজিতের তুমি সহায়, অন্তর্যামী, ত্রিভুবন স্বামী।
শ্লোক 15
দীন-দুঃখীর সংকট হরণকারী, জয় জয় জয় শ্রীকুঞ্জবিহারী!
শ্লোক 16
যে কেউ সংকটে তোমাকে ধ্যান করে, তার সংকট তৎক্ষণাৎ নাশ হয়।
শ্লোক 17
ধন, বৈভব, সুখ, সম্পত্তি পায়, যে নিত্য শ্যামচালিশা গায়।
শ্লোক 18
ভূত-প্রেতের বাধা সব টলে, যখন শ্যামনাম হৃদয়ে ধরে।
শ্লোক 19
সন্তানহীনের পুত্র লাভ হয়, কুষ্ঠীর দেহ স্বর্ণের মতো হয়।
শ্লোক 20
নির্ধনকে ধনবান বানায়, অন্ধদের প্রভু পথ দেখান।
শ্লোক 21
জয় লক্ষদাতা, জয় শীর্ষদানী! তোমার মহিমা জগতে বর্ণিত।
শ্লোক 22
ময়ূরপুচ্ছের ছড়ি যখন শীর্ষে ঘোরান, যাদুর মতো প্রভাব দেখান।
শ্লোক 23
খাটু নগর অতি পবিত্র ধাম, যেখানে বিরাজেন শ্রীঘনশ্যাম।
শ্লোক 24
সালাসর সঙ্গে অপূর্ব ধাম, বীর হনুমান সংকট হরণ করেন।
শ্লোক 25
রাধাকুণ্ডের ন্যায় পবিত্র জল, দর্শন করলে ভবপীড়া হরে।
শ্লোক 26
জয়তি জয়তি খাটুর রাজা! লাজ রেখো, কাজ সম্পাদন করো।
শ্লোক 27
সেবক জেনে দয়া করো প্রভু, প্রেমভক্তির দান আমাকে দাও।
শ্লোক 28
কলিযুগে তুমি দেব বলে পরিচিত, ভক্তদের সংকট বিস্মৃত কর।
শ্লোক 29
যে এই চালিশা নিত্য গায়, সে নিশ্চয়ই সব সুখ পায়।
শ্লোক 30
চল্লিশ দিন যারা পাঠ করেন, শ্যামকৃপায় পার হন।
শ্লোক 31
জয় শ্রীশ্যাম, জয় শ্রীশ্যাম! পূর্ণ করো সব মনস্কাম।
শ্লোক 32
চরণকমলের সেবা দান করো, অপরাধ ক্ষমা করো প্রভু, সব।
শ্লোক 33
জয় জয় মোরবী নন্দন স্বামী! কৃপা করো প্রভু অন্তর্যামী।
শ্লোক 34
চারি পদার্থ পায় জ্ঞানী—খাটুওয়ালার অমৃতবাণী।
শ্লোক 35
দীনদয়াল, কৃপালু, প্রিয়! আমরা সবাই তোমার শরণাগত।
শ্লোক 36
জয়তি জয়তি জগৎপালনহারী! জয় খাটুওয়ালা গিরিধারী!
শ্লোক 37
সকল মনোরথ পূর্ণ করো, দর্শন দিয়ে মনে আনন্দ দাও।
শ্লোক 38
শ্যামচালিশা যে নিত্য ধ্যান করে, সুখ-সম্পত্তি তার ঘরে নিত্য আসে।
শ্লোক 39
জয় শ্রীশ্যাম, জয়তি সুখদাতা! কলিযুগে তুমি ভাগ্যবিধাতা।
শ্লোক 40
সমাপন দোহা
প্রভু যেন হৃদয়ে চিরকাল বাস করেন সেই প্রার্থনা ও চালীসার সমাপ্তি দোহা।
হে কলিযুগের অবতার প্রভু, খাটুওয়ালা শ্যাম! শরণাগতের লাজ রেখে কাজ পূর্ণ করো।
শ্লোক Dohā 1
সত্য মনে যে ভজে, শ্যামনাম গুণগান করে, সে সুখ-সম্পত্তি-বৈভব লাভ করে, অন্তে বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্ত হয়।
শ্লোক Dohā 2
Worship Guidelines & Chanting Benefits (Phalashruti)
প্রতিদিন অথবা শুভ তিথিতে
ব্রাহ্ম মুহূর্ত (সকাল ৪টা - ৬টা) অথবা সন্ধ্যাবেলা
ঘিয়ের প্রদীপ, ধূপ, তাজা ফুল ও নৈবেদ্য
- মানসিক শান্তি, আধ্যাত্মিক উন্নতি ও শুভ শক্তি
প্রেক্ষাপট
এই চালিশাটি উত্তর ভারতের রাজস্থানের খাটু গাঁওয়ে অবস্থিত খাটু শ্যাম মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে ভগবান শ্যাম মহাভারতের বীর বর্ভরীক বা মোরবী নন্দনের অবতার রূপে পূজিত হন। কথিত আছে যে, কলিযুগে এই দেবতা ভক্তদের দুঃখ দূর করে সুখ ও সমৃদ্ধি প্রদান করেন। ভক্তরা সাধারণত ফাল্গুন মাসের শুক্ল দ্বাদশীর মেলা উপলক্ষে বা প্রতিদিন সকালে স্নান ও পূজার পর এই চালিশা পাঠ করে থাকেন।
আপনি কি জানেন?
শ্যাম চালিসার পরিচয়
এটি ৪০টি চৌপাই ও ২টি দোহা সম্বলিত একটি ভক্তিমূলক স্তোত্র, যা খাটু শ্যাম (বর্বরীক) দেবতার মহিমা কীর্তনে রচিত। 'চালিসা' শব্দের অর্থ 'চল্লিশ', এবং এই স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করলে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
শ্যাম কে?
শ্যাম দেবতা হলেন মহাভারতের যোদ্ধা বর্বরীক, যিনি মোরবী নন্দন (মোরবি রাজ্যের রাজকুমার) ও ঘটোৎকচের পৌত্র। তিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অংশ নিতে এসে কৃষ্ণের পরীক্ষায় তিনটি বাণ দিয়ে একটি পিপুল পাতার সব ছিদ্র করে দেন এবং নিজের মস্তক দান করেন। কৃষ্ণ তাকে 'শ্যাম' নামে আশীর্বাদ করেন এবং কলিযুগের দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিন বাণ ও পিপুল পাতার অলৌকিকতা
শ্যামের তিনটি বাণের ক্ষমতা ছিল অসীম — একটি বাণ দিয়ে তিনি সব শত্রুকে বধ করতে পারতেন। কৃষ্ণ তাকে পরীক্ষা করতে চাইলে তিনি একটি পিপুল পাতায় তিনটি বাণ নিক্ষেপ করে পাতার প্রতিটি ছিদ্র ভেদ করে দেখান, যা তাঁর অস্ত্রের অনন্য নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করে।
খাটু শ্যামের পূজা ও মেলা
রাজস্থানের খাটু ধামে শ্যামের প্রধান মন্দির অবস্থিত। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে এখানে বিশাল মেলা বসে, যেখানে ভক্তরা নিশান (পতাকা) চড়িয়ে মানত পূরণ করেন। শ্যাম কুণ্ডে স্নান করলে পাপ ও রোগ দূর হয় বলে বিশ্বাস।
শ্যামের বিশেষত্ব
শ্যামকে 'হারে কা সাথী' বা পরাজিতের সহায়ক বলা হয়। তিনি কলিযুগের দেবতা হিসেবে ভক্তের দুঃখ-কষ্ট দূর করেন, ধন-সম্পদ দেন, বন্ধ্যাকে সন্তান দেন, কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করেন এবং অন্ধকে দৃষ্টি দেন। তাঁর মোরছড়ি (ময়ূরপুচ্ছের পাখা) মাথায় ঘুরালে জাদুর মতো প্রভাব দেখা যায়।
স্তোত্রের রচনাশৈলী
এই চালিসাটি সরল ও সুরেলা ভাষায় রচিত, যাতে সাধারণ ভক্তরা সহজেই মুখস্থ করতে পারেন। প্রতিটি চৌপাই শ্যামের লীলা ও কৃপার বিবরণ দেয় এবং শেষের দোহাগুলোতে ভক্তের আশ্রয় ও মোক্ষ লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।
