চারটি দৃশ্য ও মহান ত্যাগ
প্রিন্স সিদ্ধার্থের দুঃখের কারণ অনুসন্ধান
এই নিবন্ধে প্রিন্স সিদ্ধার্থের প্রাসাদে সুরক্ষিত জীবন, চারটি দৃশ্য — বৃদ্ধ, রোগী, মৃতদেহ এবং সন্ন্যাসী — দেখার পর তাঁর মনে যে প্রশ্ন জাগে এবং সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি কীভাবে রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী ও পুত্র ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন, সেই ঐতিহ্যবাহী কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রাচীনকালে, শাক্য রাজবংশের রাজা শুদ্ধোদনের রাজধানী কপিলাবস্তু নগরে এক রাজকুমারের জন্ম হয়েছিল, যাঁর নাম ছিল সিদ্ধার্থ। রাজা শুদ্ধোদন পুত্রকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী শুনেছিলেন যে সিদ্ধার্থ হয় মহান রাজা হবেন, নয়তো মহান সন্ন্যাসী। পুত্রকে সন্ন্যাসী হতে না দেওয়ার জন্য রাজা তাঁকে প্রাসাদের ভিতরেই রাখতেন, যেখানে ছিল সুন্দর বাগান, নাচের মেয়ে, সঙ্গীত এবং সমস্ত বিলাসিতা। সিদ্ধার্থের চোখে কখনও দুঃখ, অসুস্থতা বা মৃত্যু পড়েনি, কারণ রাজা আদেশ দিয়েছিলেন যে প্রাসাদের বাইরে কোনো বৃদ্ধ, রোগী বা মৃত ব্যক্তিকে দেখা যাবে না। সিদ্ধার্থ বিবাহ করেছিলেন যশোধরাকে এবং তাঁদের একটি পুত্র ছিল, নাম রাহুল। কিন্তু একদিন, সিদ্ধার্থের মনে প্রাসাদের বাইরের পৃথিবী দেখার কৌতূহল জাগল। তিনি সারথি ছন্দককে বললেন, 'আমাকে শহরে নিয়ে চলো, আমি দেখতে চাই মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে।' রাজা প্রথমে আপত্তি করলেন, কিন্তু পুত্রের ইচ্ছার কাছে হার মানলেন। সিদ্ধার্থ যখন রথে চড়ে শহরে গেলেন, তখন তিনি প্রথম দেখলেন এক বৃদ্ধ মানুষ, যাঁর চুল পাকা, শরীর কুঁজো, হাতে লাঠি। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' ছন্দক বললেন, 'মহারাজ, ইনি একজন বৃদ্ধ। বয়সের কারণে তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে গেছে।' সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে বললেন, 'সবাই কি এমন হয়?' ছন্দক বললেন, 'হ্যাঁ, মহারাজ, প্রত্যেক মানুষই একদিন বৃদ্ধ হবে।' এই কথা শুনে সিদ্ধার্থের মন বিষণ্ণ হয়ে গেল। দ্বিতীয়বার তিনি দেখলেন এক অসুস্থ মানুষ, যিনি জ্বরে কাতরাচ্ছেন, শরীরে ঘা, মুখে কষ্টের ছাপ। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' ছন্দক বললেন, 'মহারাজ, ইনি একজন রোগী। শরীরে রোগ হলে মানুষ এমন কষ্ট পায়।' সিদ্ধার্থ বললেন, 'সবাই কি অসুস্থ হতে পারে?' ছন্দক বললেন, 'হ্যাঁ, মহারাজ, রোগ কারও জন্য অপেক্ষা করে না।' তৃতীয়বার তিনি দেখলেন এক মৃতদেহ, যাকে চারজন লোক কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে, পেছনে কাঁদছে আত্মীয়রা। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' ছন্দক বললেন, 'মহারাজ, ইনি মারা গেছেন। মৃত্যুই জীবনের শেষ।' সিদ্ধার্থ বললেন, 'আমিও কি একদিন মরব?' ছন্দক বললেন, 'হ্যাঁ, মহারাজ, প্রত্যেক মানুষই মরবে।' এই তিন দৃশ্য দেখে সিদ্ধার্থের মনে গভীর প্রশ্ন জাগল — কেন মানুষকে এত কষ্ট পেতে হয়? কেন জন্ম, রোগ, বার্ধক্য এবং মৃত্যু আছে? চতুর্থবার তিনি দেখলেন এক সন্ন্যাসী, যিনি শান্ত মুখে, কমলা রঙের পোশাক পরে, হাতে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে হাঁটছেন। সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' ছন্দক বললেন, 'মহারাজ, ইনি একজন সন্ন্যাসী। তিনি সংসারের মায়া ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে বের হয়েছেন।' সন্ন্যাসীর শান্ত মুখ দেখে সিদ্ধার্থের মনে আশা জাগল — এই মানুষটি দুঃখের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। সেই রাতে, সিদ্ধার্থ তাঁর স্ত্রী ও পুত্রের ঘরে গিয়ে শেষবারের মতো তাঁদের দেখলেন। তিনি ভাবলেন, 'আমি যদি রাজা হই, তবুও আমি বৃদ্ধ, রোগী এবং মৃত হব। কিন্তু যদি আমি সত্যের সন্ধান করি, তবে হয়তো দুঃখের অবসান হতে পারে।' তিনি ছন্দককে ডেকে বললেন, 'আমাকে ঘোড়া সাজাও, আমি আজ রাতেই প্রাসাদ ছেড়ে যাব।' ছন্দক বললেন, 'মহারাজ, রাতের অন্ধকারে কোথায় যাবেন?' সিদ্ধার্থ বললেন, 'আমি সন্ন্যাসী হব, দুঃখের কারণ খুঁজব।' ছন্দক কাঁদতে লাগলেন, কিন্তু সিদ্ধার্থের আদেশ মানলেন। সিদ্ধার্থ ঘোড়া কন্থকে চড়ে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শহরের সীমানা পেরিয়ে তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন, নিজের রাজকীয় পোশাক খুলে ফেললেন, তলোয়ার দিয়ে চুল কেটে ফেললেন এবং সন্ন্যাসীর পোশাক পরলেন। তিনি ছন্দককে বললেন, 'তুমি ঘোড়া নিয়ে ফিরে যাও, রাজাকে বলো যে আমি সত্যের সন্ধানে গেছি।' এইভাবে, প্রিন্স সিদ্ধার্থ রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী, পুত্র এবং রাজ্য ত্যাগ করে দুঃখের কারণ খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। এই ঘটনাকে বলা হয় 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' বা মহান ত্যাগ। এই সন্ধানই তাঁকে পরবর্তীতে বুদ্ধত্ব লাভে সাহায্য করেছিল, কিন্তু সেই গল্প অন্য এক দিনের।
আপনি কি জানেন?
চারটি দৃশ্যের ক্রম
প্রথম তিনটি দৃশ্য—বৃদ্ধ, রোগী ও মৃতদেহ—সিদ্ধার্থকে জীবনের দুঃখের বাস্তবতা দেখায়, কিন্তু চতুর্থ দৃশ্যে সন্ন্যাসী তাঁকে দুঃখ থেকে মুক্তির পথের ইঙ্গিত দেয়। এই চারটি দৃশ্যই তাঁর গৃহত্যাগের মূল প্রেরণা।
মহাভিনিষ্ক্রমণ
সিদ্ধার্থের রাতে প্রাসাদ ত্যাগের ঘটনাকে ‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ বা মহান ত্যাগ বলা হয়। তিনি স্ত্রী যশোধরা ও পুত্র রাহুলকে শেষবারের মতো দেখে, ঘোড়া কন্থকে চড়ে এবং সারথি ছন্দকের সাহায্যে প্রাসাদ ছেড়ে যান। পরে তিনি রাজকীয় পোশাক ও চুল ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করেন।
প্রাসাদের সুরক্ষা
রাজা শুদ্ধোদন পুত্রকে সন্ন্যাসী হতে না দেওয়ার জন্য প্রাসাদের ভিতরেই সমস্ত বিলাসিতা দিয়ে রাখেন এবং বাইরের জগতের দুঃখ-কষ্ট থেকে তাকে দূরে রাখেন। কিন্তু সিদ্ধার্থের কৌতূহল ও চারটি দৃশ্য দেখার পর তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, যা তাঁকে ত্যাগের পথে নিয়ে যায়।
সন্ন্যাসীর ভূমিকা
চতুর্থ দৃশ্যে সন্ন্যাসীকে দেখে সিদ্ধার্থ বুঝতে পারেন যে দুঃখের কারণ অনুসন্ধান ও মুক্তির পথ সম্ভব। সন্ন্যাসীর শান্ত মুখ ও ত্যাগের জীবন তাঁকে আশা দেয় এবং তিনি নিজেও সেই পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ছন্দকের ভূমিকা
সারথি ছন্দক সিদ্ধার্থের বিশ্বস্ত সহচর। তিনি সিদ্ধার্থকে শহরে নিয়ে যান, প্রতিটি দৃশ্যের ব্যাখ্যা দেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রাসাদ ত্যাগে সাহায্য করেন। ছন্দকের মাধ্যমেই সিদ্ধার্থ প্রথমবারের মতো জীবনের কঠোর বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারেন।
Buddha
বৌদ্ধধর্ম থেকে আরও
সম্পর্কিত শিক্ষা
একই শিক্ষা, বিভিন্ন ঐতিহ্যে প্রতিধ্বনিত
