বুদ্ধের শেষ দিন ও কুশীনগরে পরিনির্বাণ
এই লেখায় বুদ্ধের শেষ ভোজন, তাঁর শেষ উপদেশ 'আত্মদীপ ভব', এবং কুশীনগরে শালবৃক্ষের মাঝে তাঁর মহাপরিনির্বাণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
বুদ্ধের জীবনের শেষ দিনগুলো কুশীনগরে এসে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এক চুন্দ নামক কর্মকারের বাড়িতে তিনি তাঁর শেষ ভোজন গ্রহণ করেন। চুন্দ তাঁকে সূকরমদ্দব নামে এক বিশেষ খাদ্য পরিবেশন করেন। এই খাদ্যটি শূকরের মাংস নাকি অন্য কিছু, তা নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, এটি ছিল এক প্রকার সুস্বাদু খাবার। বুদ্ধ সেই খাদ্য গ্রহণের পর তাঁর শরীর অসুস্থ বোধ করেন। তবুও তিনি চুন্দকে দোষারোপ না করে বলেন, এই ভোজনের ফল তাঁর জীবনের শেষ ভোজন হিসেবে স্মরণীয় হবে।
অসুস্থ অবস্থায় বুদ্ধ কুশীনগরের কাছে এক জঙ্গলে যান, যেখানে দুটি শালবৃক্ষের মধ্যে একটি শয্যা পাতা হয়। তিনি সেখানে শুয়ে পড়েন, তাঁর মাথা উত্তর দিকে রেখে এবং চোখ দক্ষিণ দিকে। তাঁর চারপাশে অসংখ্য শিষ্য ও ভক্ত জড়ো হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর প্রধান শিষ্য আনন্দ। আনন্দের চোখে জল দেখে বুদ্ধ তাকে সান্ত্বনা দেন এবং বলেন, 'আনন্দ, কেঁদো না। এই পৃথিবীতে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। যা কিছু জমা হয়, তা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়।'
তারপর বুদ্ধ তাঁর শেষ উপদেশ দেন। তিনি শিষ্যদের বলেন, 'তোমরা নিজেরাই নিজের প্রদীপ হও। নিজেরাই নিজের আশ্রয় হও। অন্যদের আশ্রয় খুঁজো না। সত্যকে নিজের প্রদীপ করো, সত্যকে নিজের আশ্রয় করো।' এই উপদেশে তিনি জোর দেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরা যেন কোনো বাহ্যিক কর্তৃত্বের উপর নির্ভর না করেন, বরং নিজের প্রচেষ্টা ও ধর্মের শিক্ষা অনুসারে জীবন যাপন করেন।
এরপর বুদ্ধ তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বলা হয়, সেই সময় শালগাছগুলি অসময়ে ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল এবং আকাশ থেকে ফুল বৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর দেহ শেষকৃত্যের জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং পরে তার ভস্ম বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করা হয়। এই ঘটনা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলির একটি।
বুদ্ধের পরিনির্বাণকে বৌদ্ধরা জন্ম ও জ্ঞানলাভের মতোই একটি মহাঘটনা হিসেবে স্মরণ করে। তাঁর শেষ বার্তা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে: নিজের আলো নিজে হও। এই শিক্ষা কোনো বিশেষ ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন বাণী হিসেবে বিবেচিত।
আপনি কি জানেন?
শেষ ভোজনের রহস্য
বুদ্ধের শেষ ভোজন ছিল কর্মকার চুন্দের দেওয়া ‘সূকরমদ্দব’ নামক খাবার। এই শব্দের অর্থ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে—কেউ বলেন এটি শূকরের মাংস, কেউ বলেন এটি এক ধরনের সুস্বাদু মাশরুম বা শাক। বুদ্ধ নিজে চুন্দকে দোষ দেননি, বরং বলেছিলেন এই ভোজন তাঁর জীবনের শেষ ভোজন হিসেবে স্মরণীয় হবে।
শেষ উপদেশের মূলমন্ত্র
বুদ্ধ তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে শিষ্যদের বলেছিলেন, ‘আত্মদীপ ভব’—অর্থাৎ ‘তোমরা নিজেরাই নিজের প্রদীপ হও’। তিনি জোর দেন যে তাঁর মৃত্যুর পর কোনো বাহ্যিক কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর না করে নিজের প্রচেষ্টা ও ধর্মের শিক্ষা অনুসারে জীবন যাপন করতে হবে। এই বাণী বৌদ্ধধর্মের অন্যতম ভিত্তি।
শালবৃক্ষের অলৌকিক ঘটনা
কুশীনগরের জঙ্গলে দুটি শালবৃক্ষের মাঝে বুদ্ধ শুয়েছিলেন, মাথা উত্তর দিকে ও চোখ দক্ষিণ দিকে। তাঁর মহাপরিনির্বাণের সময় বলা হয়, শালগাছগুলি অসময়ে ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল এবং আকাশ থেকে ফুল বৃষ্টি হয়েছিল—এটি তাঁর পবিত্রতা ও ঘটনার তাৎপর্যকে চিহ্নিত করে।
আনন্দের প্রতি সান্ত্বনা
প্রধান শিষ্য আনন্দ যখন বুদ্ধের আসন্ন মৃত্যুতে কাঁদছিলেন, বুদ্ধ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘কেঁদো না, এই পৃথিবীতে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। যা কিছু জমা হয়, তা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়।’ এই শিক্ষা বৌদ্ধ দর্শনের অনিত্যবাদ (সবকিছু পরিবর্তনশীল) ধারণাকে সরাসরি স্পর্শ করে।
পরিনির্বাণের তাৎপর্য
বুদ্ধের মৃত্যুকে বৌদ্ধরা ‘মহাপরিনির্বাণ’ বলে, যা জন্ম ও জ্ঞানলাভের মতোই একটি মহাঘটনা। তাঁর দেহের শেষকৃত্যের পর ভস্ম বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করা হয়, যা আজও বৌদ্ধ স্তূপে পূজিত হয়। এই ঘটনা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ।
Buddha
বৌদ্ধধর্ম থেকে আরও
সম্পর্কিত শিক্ষা
একই শিক্ষা, বিভিন্ন ঐতিহ্যে প্রতিধ্বনিত
